‘চাণক্য’ খুইয়ে ছন্নছাড়া কংগ্রেস!

বীরেন ভট্টাচার্য
নেতৃত্ব সঙ্কটে কংগ্রেস! শতাব্দী প্রাচীন একটি দল কীভাবে ‘প্রকৃত’ নেতার অভাবে একটি পরিবারের মন জুগিয়ে শেষ হয়ে গেল, সেটাই এই লেখার মূল বিষয়। প্রথমে একটা অতীতের উদাহরণ তুলে দিই তাহলে, সালটা ঠিক মনে নেই, তবে সেই সময় কংগ্রেসের সরকার চলছে কেন্দ্রে। প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। সেই সময় অভিযোগ উঠল, কোনও একটি রাজ্যে স্কুল পাঠ্যবইতে নাকি লেখা আছে হিন্দু দেবদেবীরা সুরাপানে আসক্ত। ব্যাস, আর যায় কোথায়! প্রধান বিরোধী বেঞ্চে বসে থাকা বিজেপি, মানে ওই হিন্দু ধর্মের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তারা তো সংসদে তুলকালাম করে ফেলার জোগাড়। হঠাৎই সনিয়া গান্ধি ও প্রণব মুখোপাধ্যায়কে দেখা গেল কাছাকাছি কিছু আলোচনা করতে। দাঁড়িয়ে পড়লেন লোকসভার নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায়, শুরু করলেন উদাত্ত কণ্ঠে চণ্ডীস্ত্রোত্রপাঠ। সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ শেষ করে ইংরাজি তর্জমা করে বুঝিয়ে দিলেন তার অর্থ। সেটা কী, চণ্ডীতেই মহিষাসুর বধের সময়ে দেবীদুর্গাকে রণমূর্তি ধারণ করে সুরাপান করার কথা রয়েছে, ব্যাস। চুপ হল হিন্দুধর্মের রক্ষাকর্তারা। সে যাত্রায় রক্ষা পেল কংগ্রেস।
বীরভূমের মিরিটির এই ব্রাহ্মণ সন্তানের বাগ্মিতার জোরে সংসদের ভিতরে-বাইরে অনেক বড় বড় ধাক্কা থেকে রক্ষা পেয়েছে কংগ্রেস। নেতার আরও উদাহরণ দিই, পাকিস্তান (তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান) থেকে বাংলাদেশকে আলাদা করতে তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী তৎপর। আমেরিকা ভারতের সঙ্গে চিরকালীনই খলনায়কের ভূমিকায় কাজ করেছে, মানে সাপ হয়ে কামড়ানো আর ওঝা হয়ে ঝাড়া আর কী। রাষ্ট্রসংঘের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। প্রথমে সাড়া পাননি। কারণ, বিশ্বের সর্বোচ্চ সংস্থাটির যুক্তি ছিল, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত কেন নাক গলাতে তৎপর। ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ থেকে ‘লৌহমানবী’ হয়ে ওঠা ইন্দিরা গান্ধি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, ভারতের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সেখানকার লোকজন ভারতে আসতে শুরু করেছেন দলে দলে, ফলে এদেশে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সঙ্কট দেখা গিয়েছে। ইন্দিরার যুক্তি মেনে নিয়ে সেনা নামানোর পক্ষে সায় দিয়েছিল রাষ্ট্রসংঘ। পরের ইতিহাসটা সবার জানা, সুন্দর একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশের জন্ম।
উপরের দুটি গল্পের অবতারণা করলাম নেতার গুরুত্ব বোঝাতে। সেই দলের বর্তমান পরিস্থিতি দেখুন। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ইত্যাদি নিয়ে। অথচ সেই ক্ষোভ কাজে লাগানো বা আন্দোলন করার কোনও দায়ই নেই কংগ্রেসের। আজ পর্যন্ত বিজেপি খারাপ, বলা ছাড়া বিরোধী দল (রাজনৈতিকভাবে) হিসেবে কংগ্রেস কী করেছে? কিছুই করেনি। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসা এবং ২০১৯-এ আসন বাড়িয়ে ক্ষমতায় ফেরা বিজেপি সরকার, এবং মোদি-শাহ জুটি এখন কার্যত অপরাজেয় গোলিয়াত। তাকে হারানোর পর্যন্ত ডেভিড আকবর রোডে কোথায়? লোকসভা ভোটের ৬ মাস আগে দখলে আসা রাজ্যগুলি রাখতে পেরেছে কংগ্রেস? কর্ণাটক হাতছাড়া, মধ্যপ্রদেশ চলে গেছে, সঙ্গে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মতো তরুণ তুর্কি নেতা, রাজস্থানের ড্রামা তো চলছে। তাহলে দেশের জনগণ কেন ভোট দেবে কংগ্রেসকে? শুধুমাত্র অপর জনকে খারাপ বলে যেমন নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো যায় না, তেমনই অন্য একটি রাজনৈতিক দলকে খারাপ বা তার সবই গণতন্ত্রের পক্ষে অশুভ বলে সেই সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসা যায় না, এটা কংগ্রেস দলের কতজনের উপলব্ধি হয়েছে জানা নেই।
কংগ্রেসে সিন্ডিকেট আর বৃদ্ধতন্ত্র জাঁকিয়ে বসেছে, এই মারণব্যাধি সারাতে না পারলে দলকে চরম মূল্য চোকাতে হবে, সেটা কি সনিয়া গান্ধি বুঝতে পারছেন না? আমার তো মনে হয় না। রাজ্যের বাসিন্দারা বিজেপির বিরোধিতা করে কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার পর, তারা যদি সেই সরকার টিকিয়ে রাখতে নাই পারে, তাহলে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার কী প্রয়োজন আছে! বিজেপিকে ভোট দিলেই তো হয়। লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে, যেখানে বিজেপি নির্দিষ্ট ইস্যু (জাতীয়তাবাদ) ফোকাস করে প্রচার তুঙ্গে তুলেছিল, সেই অর্থে কংগ্রেসের কোনও প্রচারই হয়নি, যা বিজেপিকে টেক্কা দিতে পারে। বিপনণ এবং প্রচারের যুগে যদি সেখানেই ঘাটতি থাকে, তাহলে আর কিছুই বলার নেই। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব এমন একজনকে দেওয়া হয়েছে, যিনি নিজেই অসুস্থ, পরিশ্রম করতে পারেন না। রাজস্থানে অশোক গেহলতকে কেন মুখ্যমন্ত্রী করা হল শচীন পাইলটকে এড়িয়ে, তার কোনও সদুত্তর নেই। মধ্যপ্রদেশে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে কিছুই দেওয়া হল না…, অথচ কমলনাথকে সভাপতি এবং মুখ্যমন্ত্রী করা হল, তার পরিণাম আমরা সবাই চাক্ষুষ করলাম।
লোকসভার একটা গল্প দিয়ে শেষ করি, রাফাল নিয়ে তখন সংসদে ভিতরে-বাইরে তুমুল হট্টগোল চলছে। দেশের প্রথম সারির একটি মোবাইল সংস্থাকে রাফালের বরাত দেওয়া হয়েছে বলে বিজেপিকে প্রবল চেপে ধরেছে কংগ্রেস, সায় দিয়েছে বিরোধীরা। রাহুল গান্ধিও বহু বক্তব্য রাখলেন তাঁর মতো করে। কিন্তু কী হল, সেই সময় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি উঠে তাঁর জবাবি ভাষণে প্রমাণ বললেন, ওই সংস্থাকে রাফালের বরাত দেওয়া হয়নি। ব্যাস, প্রতিবাদের বেলুন চুপসে গেল। কিছুই বলার রইল না। ফলে এভাবে ছেঁদো কিছু প্রতিবাদে কিছুই আসবে না লোক হাসানো ছাড়া। সমস্ত দিক বিবেচনা করে ম্যাডাম সনিয়া গান্ধি যদি দলের নেতাদের এবং দলকে আয়নার সামনে দাঁড় করান, তাহলে হয়তো আগামীতে বড় বিপর্যয় থেকে দল বাঁচতে পারে, নাহলে ১০ বছর পর মানুষ কাগজে-কলমে জানবে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস বলে কোনও দল ছিল।
বীরেন ভট্টাচার্য, রাজনৈতিক সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি, ফোন : +৯১ ৬২৯৬৬ ৩১৬৪৮ (মতামত ব্যক্তিগত)
ছবি ঋণ : ইন্টারনেট
Comments are closed.