ভারতীয় রাজনীতির নয়া সমীকরণ ‘রিসর্ট’ কালচার

বীরেন ভট্টাচার্য
দেশ এগিয়েছে সভ্যতা এগিয়েছে, দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। জনতার ক্ষমতা হাতে নিয়ে কুর্সিতে বসা রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতালিপ্সাও দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। ক্ষমতার অন্দরের কূটকচালির আমূল পরিবর্তনও হয়েছে। ইদানীং বিরোধী দলগুলির হাতে থাকা বোর্ড, রাজ্য শাসকদলকে ছিনিয়ে নিতে দেখা গিয়েছে, ছলে বলে কৌশলে বিরোধীদের ক্ষমতাশূন্য করে দেওয়াটাই যেন আজকের শাসকদলগুলির একমাত্র লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। তবে এর বীজ বপন হয়েছিল অনেক আগেই। তারজন্য টাইমমেশিনে চেপে বেশ কিছুটা পিছনে যেতে হবে।
স্বাধীনতার তখন প্রায় এক দশক কেটে গিয়েছে। ১৯৫৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কেরলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া। দেশের মধ্যে প্রথম কমিউনিস্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসার কিছু সময় পরেই শিক্ষাসংক্রান্ত একটি বিল পাস করেন মুখ্যমন্ত্রী ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ। যিনি ছিলেন প্রচণ্ড ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন, গ্রন্থপ্রণেতা এবং অন্যতম কমিউনিস্ট নেতাও। কেরলের কমিউনিস্ট সরকারের পাস করানো বিলে শিক্ষকদের ভাল বেতন এবং চাকরির শর্তে কিছু রদবদল করা হয়। আর তাতেই ক্ষেপে ওঠে সেখানকার ক্যাথলিক চার্চ মিশনগুলি। তাদের বক্তব্য, এর ফলে তাদের ক্ষমতার অলিন্দে অনুধিকার প্রবেশ করছে সরকার। সেই রোষানলের আঁচে রাজনীতির রুটি সেঁকতে নেমে পড়ে সদ্য ক্ষমতা হারা কংগ্রেস। সেই বিক্ষোভের নেতৃত্বে ছিলেন নায়ার নেতা এবং স্বচ্ছভাবমূর্তি ও মহাত্মা গান্ধির অনুগামী মন্নথ পদ্মনাভ পিল্লাই। বিক্ষোভ, ধর্মঘট, প্রতিবাদে উত্তপ্ত হতে থাকে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। প্রায় লক্ষাধিক বিক্ষোভকারীকে জেলবন্দি করা হয়, ২৮৪ বার লাঠিচার্জ করা হয়, বহু বিক্ষোভকারী প্রাণ হারান। পরে পুলিশের হাতে একজন সন্তানসম্ভবা মহিলার মৃত্যু হয়, আর তাতেই বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। প্রবল চাপের মুখে ১৯৫৯ সালে কেরলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। ভোটের সময় মৃতার ছবি সম্বলিত পোস্টার হাতে প্রচার করে কংগ্রেস এবং কেরল ‘পুনরুদ্ধার’ করে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রবীণ নেতার পাশাপাশি আমারও মনে হয়, বিরোধীদের হাতে থাকা সরকার ফেলে দেওয়ার বীজ বপন হয়েছিল তখনই। পরে সেভাবে আর সরকার ফেলে দেওয়া বা সেই ধরনের কোনও ঘটনা সামনে আসেনি। ২০১৪ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের রাজনীতির অভিমুখের অনেকটাই বদল হয়েছে। গোয়াতে বিধানসভা নির্বাচনের পর দেখা যায়, বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে কংগ্রেস, দ্বিতীয়স্থানে বিজেপি। অথচ সরকার গঠন করল বিজেপি, এতে একদিকে যেমন কংগ্রেসের গড়িমসি, আঠারো মাসে বছর এবং তাদের বিভিন্ন জড়তা রয়েছে, তার উল্টোদিকেই রয়েছে বিজেপির ক্ষমতা দখলের ক্ষিপ্রতা। সেখানে আঞ্চলিক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়ে বিজেপি। সবচেয়ে বড় উদাহরণে আসছি এরপর।
২০১৮ সালে একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়। লোকসভা ভোটের আগে সেই রাজ্যগুলির বিধানসভা নির্বাচন ছিল কংগ্রেস-বিজেপির কাছে সেমিফাইনাল। কর্নাটক, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, তেলাঙ্গানা, মিজোরামের নির্বাচনে ক্ষমতা দখল করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কংগ্রেস, বিজেপি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলি। কর্নাটকে বৃহত্তম দল কংগ্রেস, এছাড়াও ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানেও ক্ষমতা দখল করে শতাব্দী প্রাচীন দলটি। কর্নাটকে জেডিএস-এর সঙ্গে জোটে ক্ষমতায় আসে তারা। মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহ্বানের ক্ষমতায় ফেরা আটকে দেয় কমল নাথ-দিগ্বিজয় সিং-জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া জুটি, রাজস্থানে অশোক গেহলত-শচীন পাইলট, ছত্তিশগড়ে কুর্সিতে বসেন ভূপেশ সিং বাঘেল। মোটামুটি দেড় বছর অতিক্রান্ত কংগ্রেসের সেইসব জয়ের ছবি।
আর এখন! মানে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী অবস্থা? অনেক আগেই পতন হয়েছে কর্নাটক সরকারের, মধ্যপ্রদেশ সরকারের নাটকীয় টালবাহানার পরে হাত ছেড়ে পদ্মবাগানে গিয়েছে সিন্ধিয়া রাজপরিবারের সন্তান। সেখানে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। রাজস্থান আজ যায়, কাল যায় অবস্থা, মামলা হয়েছে সু্প্রিম কোর্টে।
এগুলো সবই উদাহরণ মাত্র। কর্নাটকে দেখা গেল, প্রথমে অনাস্থা ভোটের আগেই পদত্যাগ করলেন ইয়েদুরাপ্পা, পরে আবার আস্থা ভোটে শাসকের পরাজয়। পিছনে কী, বিদ্রোহী বিধায়ক! মধ্যপ্রদেশ : দীর্ঘদিন ক্ষোভের বারুদ জমছিল জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার মনে, তাতে অগ্নিসংযোগ করেছেন অশোকা রোডের ম্যানেজাররা। রাজস্থানেও তাই।
তারইমধ্যে একটা বিষয় চালু হয়েছে ভারতীয় রাজনীতিতে, সেটা হল ‘রিসর্ট’, ‘হোটেল’ পলিটিক্স। রাজ্যের শাসকদলের পতন ঘটাতে, আস্থা ভোটে জিততে বিধায়কদের রাখা হচ্ছে পাঁচতারা ঝা চকচকে হোটেলে বা বিলাসবহুল রিসর্টে। একজন বিধায়ক হয়তো সারাজীবনের সৎভাবে উপার্জন করা টাকায় দীর্ঘদিন কেন, দু-একদিন ওই ক্যাটাগরির হোটেলে, রিসর্টে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। তারসঙ্গে রয়েছে অর্থের প্রলোভন। সারাজীবনে একজন বিধায়ক সৎভাবে যে টাকা রোজগার করেন, তার প্রায় কয়েকশো গুন টাকা দেওয়া হচ্ছে দলবদলের ‘ইনাম’ হিসেবে। সেই টাকার অঙ্ক কিন্তু আমার, আপনার হিসেবের মধ্যে আসার কথা নয়। মানে কোটি কোটি টাকা।
এই টাকা কোথা থেকে আসে, সেসব প্রশ্নে আমরা যাচ্ছি না। প্রশ্ন হল, টাকা-পদ যদি বড় হয়, তাহলে খোলা জায়গায় নিলাম করে নেতা-বিধায়ক কেনাবেচা করা হোক। যে সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে সেই সমস্ত ‘মহান’ নেতাদের নিলামে ওঠার জায়গা করে দিলেন, তাঁদের কি রায়ের কোনও মূল্য নেই? যদি নাই-বা থাকে তাহলে বন্ধ করে দেওয়া হোক ভোটের নামে এই মচ্ছপ, খোলা বাজারে যে যত টাকা পারবে, রিসর্টে যে যতজনকে লুকিয়ে রাখতে পারবে, তারাই ক্ষমতা দখল করুক। তাহলে বেঁচে যাবে কোটি কোটি টাকা, নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচুক দেশের কোটি কোটি আমজনতা।
বীরেন ভট্টাচার্য, রাজনৈতিক সংবাদদাতা, নয়াদিল্লি, ফোন : +৯১ ৬২৯৬৬ ৩১৬৪৮ (মতামত ব্যক্তিগত)
ছবি ঋণ : ইন্টারনেট
Comments are closed.