Bengal Fast
বিশ্ব মাঝে বাংলা খবর

নতুন শিক্ষানীতি : ভক্ত ও নিন্দুকের দৃষ্টিভঙ্গি

শোভন সেন

স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও এসে গেল নতুন শিক্ষানীতি। মিডিয়ার বদান্যতায় উৎসাহিত মানুষ ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন শিক্ষানীতির মূল প্রস্তাবগুলি। নবম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠক্রম আটটি সেমিস্টারে ভাগ করা, এমফিল কোর্স উঠিয়ে দেওয়া, সংস্কৃতের গুরুত্ব বৃদ্ধি, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, বিজ্ঞান-কলা-বাণিজ্য বিভাগের বিষয়গুলির মিশে যাওয়া, এহেন কিছু শিরোনাম চোখে আসছে। স্নাতকস্তরের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দেওয়া ও ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক’-এর নাম ‘শিক্ষা দফতর’ হওয়ার প্রস্তাবও এতে আছে।

সরকারের নেওয়া সব সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সরকারবিরোধী মানুষজন প্রতিবাদ করেন, সমালোচনা করেন, সরকারপন্থী নেতা ও মানুষেরা ধন্য ধন্য করেন– মোটামুটি এটাই দস্তুর। এখানেও তার অন্যথা হয়নি। যদিও প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষানীতি প্রণয়ন কার্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন না তবুও তাদের প্রশংসা বা নিন্দা করার ইচ্ছা ও মানসিকতাই বহুলাংশে সমালোচকদের প্রশংসাসূচক বা নিন্দামূলক মতামতকে প্রভাবিত করে। তবে ক্ষমতাসীন দলের দলীয় নীতি শিক্ষানীতির মাধ্যমে অনেক সময়ই প্রয়োগ করা হয় এও সত্য।

- Sponsored -

সংস্কৃত ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধিতে যেমন সরকারপন্থী মানুষজন দেশপ্রেম এবং ভারতীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির গভীরে যাওয়ার প্রয়াস রূপে দেখছেন, সরকার-বিরোধীরা আবার একে শিক্ষার্থীর মনে অকারণ চাপ সৃষ্টি ও পুরানো অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেই দেখছেন। বহু দেশেই একটি পরীক্ষার ওপর ভরসা না করে সেমিস্টার ভিত্তিক পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। সরকারকে যারা ভালবাসেন তারা তাই নবম থেকে দ্বাদশ সেমিস্টার ভিত্তিক পাঠ প্রস্তাবে আধুনিকতা, প্রগতি, দূরদৃষ্টি এসব খুঁজে পেয়েছেন প্রবল ভাবে। আবার সরকারের যারা নিন্দুক তারা দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা উঠে যাওয়াতে সাধারণ শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক পর্যন্ত ন্যূনতম সার্টিফিকেট অর্জনের সিস্টেমের বিলোপ সাধনের ক্ষুব্ধ।

মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে কি অর্ধেক সেমিস্টার হবে, না সাততাড়াতাড়ি সেই স্কুলগুলিকে উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে উন্নত করা হবে সে প্রশ্নও উঠছে। শিক্ষানীতিতে প্রস্তাবের সমাহার বাড়লেও শিক্ষা বাজেটের টাকা বাড়েনি একথাও সমালোচকরা বলছেন। তারা বলছেন, স্নাতক স্তরে বর্ষ-বৃদ্ধিতে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আরও দীর্ঘসূত্রী হল। শিক্ষার বেসরকারিকরণের নানা পরিকল্পনারও কৌশলী ভিত্তিপ্রস্তর হল এই শিক্ষানীতিতে, অভিযোগ উঠছে এমনটাও।

বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগের পৃথকীকরণ সূত্রের অবলুপ্তিকরণ সরকারপ্রেমীরা প্রগতির সূচক হিসেবেই তুলে ধরছেন। এখন প্রশ্ন, নানা রাজ্যে নানা বোর্ডে নানা মাধ্যমে এই শিক্ষানীতির কতটুকু প্রয়োগ হওয়া সম্ভব! ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলিতে বা মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের নিদান প্রয়োগ কতটুকু বাস্তবোচিত, একি আদতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালানোর অঙ্কুর প্রয়াস? শিক্ষা যৌথ তালিকায় থাকা সত্ত্বেও রাজ্যগুলির কোনও মতামত নেওয়া হয়নি অভিযোগ উঠছে এমনটাও। তবে যেকোনও নতুন ব্যবস্থা, সে স্কুলে দৈহিক শাস্তি বিলোপসাধনই হোক বা পাশ-ফেল প্রথা অবলুপ্তিকরণ; তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মানুষ রে রে করে ওঠেন বরাবর। কেননা সরকারের তরফ থেকে কোনওদিনই দীর্ঘদিন চলে আসা সিস্টেম পরিবর্তনের কারণগুলো খোলসা করে বলা হয় না। রোগীর যেমন অধিকার আছে তাঁর চিকিৎসা-পদ্ধতি সম্বন্ধে তার মতন করে জানার-বোঝার; যদিও বেসরকারি ব্যাবস্থাতেও ডাক্তারবাবুরা সে সময় ও ধৈর্যের দাবিকে আমল দিতে নারাজ; তেমনি অভিভাবকবৃন্দের জানার অধিকার আছে তাঁর সন্তান-সন্ততির শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিবর্তন হল সেই পরিবর্তনের কারণ কী, তা জানা। কী কী যুক্তির ওপর নির্ভর করে সেই পরিবর্তনগুলো সাধন করা হল এ বিষয়ে সরকার থেকে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে অভিভাবকের হাতে তুলে দিলে ব্যাপারটি গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর হয়। শিক্ষা গ্রহীতা কি সেই পরিসর পাবেন?

শোভন সেন : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক (মতামত ব্যক্তিগত)
ছবি ঋণ : ইন্টারনেট

Subscribe to our Whatsapp Group for daily news alerts.


You might also like

- sponsored -

Comments are closed.