নারীর কল্যাণসাধনে অনন্য অবলা

মৌমিতা বসাক
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে তখন মহিলাদের ডাক্তারি পড়ার অনুমতি ছিল না। চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য মাদ্রাজ শহরে যাত্রা করলেন এক বাঙালি নারী। বরিশালনিবাসী দুর্গামোহনের দ্বিতীয় কন্যা অবলা দাস। বেথুন স্কুল থেকে এফএ পাস করে বাংলা সরকারের শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে ১৮৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেন অবলা। কিশোরীর লক্ষ্য সাদা গাউন, আর স্টেথোস্কোপ।
এরপরেই মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেন তিনি। মাদ্রাজে মেয়েদের হস্টেল না থাকায় মিস্টার জেনসেনের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন অবলা। তবে স্বপ্নপূরণ হল না। মাঝপথেই থমকে যায় অবলা দাসের পড়াশোনা। চিকিৎসাশাস্ত্রের পাঠ অসমাপ্ত রেখেই মাদ্রাজ ছাড়েন তিনি। দু’বছরের একটি নির্দিষ্ট পাঠক্রম শেষ করার জন্য মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজের তরফে তাঁকে দেওয়া হয় ‘সার্টিফিকেট অফ অনার’।

১৮৬৫-র ৮ এপ্রিল বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন দুর্গামোহন দাস ও ব্রহ্মময়ী দেবীর দ্বিতীয় সন্তান অবলা। দুর্গামোহন দাসের প্রশ্রয়ে মুক্ত বাতাসেই বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। মাঝপথে ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিলেও লড়াইটা থামল না। ডাক্তারি পড়া দিয়ে গল্পের শুরু হলেও সেখানে যুক্ত হল বিয়ে, সংসার, নারীশিক্ষার প্রচার। ১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অবলা দাস হলেন অবলা বসু (Abala Bose)। দেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসকের তকমা অর্জন করতে না পারলেও সমাজ সংস্কার ও নারীশিক্ষার প্রসারে এক অন্যন্য নাম হয়ে উঠলেন তিনি। নারীর শিক্ষা, ভালো পাত্র পাওয়ার উপলক্ষ নয়- এই বার্তা নিয়েই বাংলার মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন শিক্ষার আলো।


বিধবাদের আর্থিক সহায়তা দিতে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নারী শিক্ষা সমিতি’। গ্রাম-বাংলায় মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিধবাদের স্বনির্ভর করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন তিনি। সংসারের আর্থিক অনটনেও থেমে যায়নি তাঁর লড়াই। ১৯১০ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সম্পাদিকার দায়িত্ব পালনে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দেন অবলা। দিদি সরলা রায়ের সঙ্গে ১৯২০-তে প্রতিষ্ঠা করেন গোখেল মেমোরিয়াল মেমোরিয়াল স্কুলটিও।

সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি জীবনের অন্য একটি ভূমিকাতেও যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন অবলা। বাংলায় ভ্রমণকাহিনি– এই ঘরানাটিতেও নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। সেই সময়ের ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকাতে ছাপা হত তাঁর লেখা। ১৩০২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ ও পৌষ সংখ্যার ‘মুকুল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘কাশ্মীর’ ভ্রমণকাহিনি। ভ্রমণকে জীবনের বৃহত্তর অর্থে আবিষ্কার করেছে অবলা বসুর লেখনী। এটাই বোধহয় তাঁর লেখার সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য। ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতাই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সব কর্মসাধনার উৎস। ১৩৩২ বঙ্গাব্দে ‘প্রবাসী’তে তাঁর এই প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের কথা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাঙ্গালী মহিলার পৃথিবী ভ্রমণ’। অনন্য সৃষ্টি ‘লুপ্তনগরী’। ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে যখন ‘নারী স্বাধীনতা’ শব্দটার সঙ্গে সবেমাত্র পরিচয় ঘটছে শহর কলকাতার, রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সেই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন ব্রাহ্ম সমাজের আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা– সমাজের সেই চালচিত্রে বাবার প্রশ্রয়ে মুক্ত বাতাসে বড় হয়েছিলেন অবলা দেবী। নারীর কল্যাণসাধনের পাশাপাশি বিজ্ঞানসাধনায় পাশে থেকেছেন স্বামী জগদীশচন্দ্র বসুরও। স্ত্রীর মেধা এবং পারদর্শিতাকে সম্মান করতেন জগদীশচন্দ্রও।
Comments are closed.