Bengal Fast
বিশ্ব মাঝে বাংলা খবর

নারীবাদ : শুধু ‘মেয়ে’ হিসেবে আলাদা করতে চাইছি, ‘মানুষ’ হিসেবে নয়

সুতৃষ্ণা দলপতি

ফেমিনিজম অর্থাৎ নারীবাদ। কথাটার মধ্যেই কেমন যেন ভারী ভারী ভাব। নারী না পুরুষ– পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এগিয়ে কে? নাকি দুজনেই সমান। এ প্রশ্ন বহুকাল ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমনকী তা নিয়ে বাংলা সিনেমায় উত্তমকুমার ও মিঠু মুখোপাধ্যায়কে গান বাঁধতেও দেখা গিয়েছে। যেখানে নারী-পুরুষ সমান বলে দাবিও করা হয়েছে। আসলে নারীবাদ বলতে এককথায় বোঝায় নারী ও পুরুষের সমান অধিকার। এর মূল লক্ষ্যই হল তথাকথিত সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে লিঙ্গ-বৈষম্য রয়েছে তার অবসান।

ফেমিনিস্ট অর্থাৎ নারীবাদীদের দাবি নির্বাচনী অধিকার, উত্তরাধিকারী সম্পত্তির অধিকার, শিক্ষার অধিকার, বৈবাহিক জীবনে সমানাধিকার, রাজনীতি ও ব্যবসার সমান সুযোগ, সমকাজে সমবেতনের অধিকার। অর্থাৎ নারীবাদ মানে পুরুষ বিদ্বেষ নয়, পুরুষের সমান হওয়া। এতো গেল নারীবাদের আক্ষরিক অর্থ। তবে ফেমিনিজিম যদি নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে আসে, তবে যুগ যুগ ধরে নারীরা কেন এত লাঞ্ছিত, অবহেলিত, বঞ্চিত! আর তাই নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করতে নারীকে রক্ষা করার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যাবে, যুগের পর যুগ নারীকে দুর্বল করে রেখেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। আসলে আমাদের সমাজের যেন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, নারী মানেই তাকে লাজুক হতে হবে। নারী মানেই যেখানে খুশি, যখন খুশি বেরনো চলবে না। নারী মানেই গলা উঁচিয়ে কথা নয়। অর্থাৎ নারী মানেই মুখ বুঝে অন্যায়কে সহ্য করা। প্রতিবাদ করা নয়। আর এখানেই ফেমিনিজমের আবির্ভাব।

- Sponsored -

নারীকে সাহসী, প্রতিবাদী, আত্মবিশ্বাসী করতেই জন্ম নারীবাদের। ঊনিশ শতকে ফরাসি দার্শনিক চার্লস ফুরিয়ে প্রথম ‘নারীবাদ’ শব্দটির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার করেন। নারীবাদ বিভিন্ন রকমের হয়। যেমন ‘লিবারেল ফেমিনিজম’ যা কিনা নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের ওপর জোর দেয়। দ্বিতীয় হল ‘রেডিক্যাল ফেমিনিজম’ যা সমাজে বেশ কিছু ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ কিছু অধিকারের দাবি করে। ‘মার্কসিস্ট’ ও ‘সোসিলজিস্ট ফেমিনিজম’ নারীদের শোষণের জন্য এরা পুঁজিবাদকে দায়ী করে। ‘কালচারাল ফেমিনিজম’ সাংস্কৃতিক ভাবে নারীদের জোর দেয়। ‘ইন্টার সেকশনাল ফেমিনিজম’ নারী-পুরুষের সমানাধিকারকে সমর্থন করে।

বর্তমানে প্রকৃত নারীবাদের সুর ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। সে তুলনায় বাড়ছে দেখনদারি। নারীবাদের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে যার মূল অর্থটাকেই কালিমালিপ্ত করছি আমরা। যার বহু উদাহরণ রয়েছে সমাজে। ২০১৫ সালে হিন্দ মোটরের কাছে লেডিস স্পেশালে ধাক্কা দিয়ে এক তরুণকে ফেলে খুন করা হয়েছিল। লেডিস স্পেশালে ওই তরুণের ওঠার অপরাধ কি এতটা ‘নৃশংস’! কীভাবে মানুষ এমন হতে পারে, তার উত্তর অজানা। আসলে মানবিকতা এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে যে আজকাল আমরা নিজেদেরকে শুধু মেয়ে হিসেবে আলদা করতে চাইছি। মানুষ হিসেবে নয়। কিন্তু এটাই তো নারীবাদের প্রকৃত অর্থ নয়?

 

আসলে নারীবাদকে সামনে রেখে তাকে ব্যবহার করে, তার আড়লে অনাচার করে চলেছি আমরা। আর যতদিন এই অনাচার বন্ধ না হবে ততদিন প্রকৃত নারীবাদীরাও বিনা কারণে মানুষের রোষের মুখে পড়বেন। এটা মনে রাখতে হবে ক্ষেত্রবিশেষে নারীরাই নারীদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। সে সংশয় বাড়িতে হোক বা অফিসে। এটা ভুললে চলবে না পণপ্রথা থেকে যৌননির্যাতন, ধর্ষণ সবেতেই সোচ্চার হচ্ছেন নারীবাদীরা। তাই পিছিয়ে-পড়া এই নারীসমাজে টিকে থাকতে হলে পুরুষ বিদ্বেষ নয়, পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আর এজন্য আমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্ব নিতে হবে এই নারীবাদের মূল সুরটি ফিরিয়ে আনার জন্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক হতে হবে আমাদের। দুইয়ের মিলিত প্রয়াসেই গড়ে উঠবে সুন্দর পৃথিবী। আর এই সুন্দর পৃথিবীর দাবিদার হবে উভয়েই।

সুতৃষ্ণা দলপতি : সাংবাদিক। মতামত ব্যক্তিগত।
ছবি ঋণ : ইন্টারনেট

Subscribe to our Whatsapp Group for daily news alerts.


You might also like

- sponsored -

Comments are closed.