কলকাতার ব্যান্ডবাদকরা এখন ফুটপাতের সবজি বিক্রেতা

রূপম চট্টোপাধ্যায়
স্বাধীনতা দিবসের প্রভাতফেরিতে এবার ওদের ডাক পড়েনি। জীবনে প্রথম এমন একটি দিনে ব্যান্ডে কাঠি পড়বে না। ওরাও থমকে গেছে অজানা ভাইরাসের আতঙ্কে। যে হাতগুলো ছন্দে মাতিয়ে তুলত এবং যে সুরে শরীর আন্দোলিত হত, তা থেমে আছে সময়ের কাছে হার মেনে। কলকাতায় ব্যান্ডের আওয়াজ আজ স্তব্ধ। করোনা আক্রান্ত শহরে ব্যান্ডপার্টির গদিতে ঝাঁপ পড়েছে সেই মার্চ মাসের শেষ দিকে। তাই তিন প্রজন্মেরও বেশি কলকাতায় বেড়ে ওঠা মেহবুব ব্যান্ড, বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যান্ড, মা তারা ব্যান্ড-এর মতো প্রায় ৫০টি ব্যান্ড পার্টি আজ মাসের পর মাস মৌন। এই মৌনতায় শুধু তাদের রুটিরুজিতেই টান পড়েনি, টান পড়েছে তাদের নিয়মিত অনুশীলন ও সুর চর্চায়। এই শহরের আনন্দ উৎসবে এক প্রধান অঙ্গ ব্যান্ড পার্টি। দিন বদলের সাথে তাল মিলিয়ে এই ব্যান্ডের চাহিদা বেড়েছে কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। গোড়ায় সাবেক বিয়ে পৈতে অন্নপ্রাশন বাড়িতেই ডাক পড়ত ব্যান্ডপার্টির। সময়ের সাথে সাথে ডাক আসতে শুরু করে পুজো-সহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রায়। এমনকী ভোটের প্রচার থেকে শহিদ দিবসের মিছিলেও এঁদের ঝংকার শোনা যায়। মধ্য কলকাতার মহাত্মা গান্ধি রোডেই আছে প্রায় ৩৫টি ব্যান্ডপার্টির দোকান বা গদি। ডাক না থাকলে রোজ বিকেলেই নিয়ম করে চলে দলের অনুশীলন। সেক্সো ফোন, সানাই, বাঁশি, বড় ড্রাম, সাইড ড্রাম থেকে সিন্থেসাইজার সবই এখন ব্যান্ডের অনুষঙ্গ। মহাত্মা গান্ধি রোড ছাড়াও মহাজাতি সদন ও চিৎপুরেও আছে এই ব্যান্ড পার্টির ডেরা। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যান্ড পার্টি শতবর্ষ পেরিয়ে এখনও স্বমহিমায় সচল।
বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যান্ডের বর্তমান কর্ণধার মহম্মদ নাদিম উদ্দিন জানালেন, তিনি এই ব্যান্ড ব্যবসার তৃতীয় প্রজন্ম। গত কয়েক বছরে ভোটের বিজয় উৎসবে ব্যান্ডের কদর বেড়েছে। এছাড়া এই শহরের সারা বছরই লেগে থাকে নানা পুজো পার্বণ যা ব্যান্ড ব্যবসার বড় ভরসা। নিউ মেহবুব ব্যান্ডের ক্যাপ্টেন তথা মূলবাদক শেখ নাসির হোসেন জানিয়েছেন, খুশির ইদ থেকে ছটপুজো সব কিছুতেই ডাক পড়ে তাদের কিন্তু গত প্রায় চার মাস ধরে কেউ তাদের ডাকেনি।
ভিন রাজ্য থেকে আসা ব্যান্ডের সাথে যুক্ত অনেকেই বাড়ি ফিরে গেছেন। আবার কেউ কেউ সুদিনের অপেক্ষায় দাঁতে দাঁত চেপে শহরেই আছেন। এদেরই একজন মঙ্গল দাস, শেখ মুজিবুর এখন শিয়ালদহ অঞ্চলের ফুটপাতে অনভ্যস্ত হাতে সবজি বিক্রি করছেন।
এই ব্যান্ড দলগুলির একটি সংগঠন আছে। অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠায় তারা এখন সাহায্য চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লেখার তোড়জোড় শুরু করেছে। লিয়াকত হোসেন ও কেশব মণ্ডলদের ধারণা শহরে থেকে যাওয়া প্রায় ৭০০ ব্যান্ডবাদকের দিকে নিশ্চয়ই সরকার নজর দেবে। কারণ সরকারই বিয়ে-সহ সব অনুষ্ঠান বাড়িতে ৫০ জনের বেশি লোকসমাগমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাতেই তাদের বেড়েছে বিপত্তি।
Comments are closed.