দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে বিক্ষিপ্ত অশান্তি! সব নজর নন্দীগ্রামে

নিজস্ব সংবাদদাতা : শুরুটা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দিনের প্রথমার্ধে নন্দীগ্রামের বুথে বুথে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল বিজেপি প্রার্থীকে। দুপুরে দিনের শেষে ৮৫ শতাংশ ভোট পড়বে বলে দাবি করেছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু দিনের শেষে সমস্ত প্রচারের আলো কার্যত শুষে নিলেন নন্দীগ্রামের তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই একুশের নির্বাচনের লাইমলাইটে চলে আসে নন্দীগ্রাম। ভোট ময়দানের কেন্দ্রবিন্দু হয় মমতা-শুভেন্দু। ভোটগ্রহণের দিনেও সেই ছবি বদলালো না। এদিন মমতা-শুভেন্দুর দ্বৈরথে কার্যত প্রচারের আলো ছাড়াই নন্দীগ্রাম ঘুরে বেড়ালেন সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়।
বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও বাঁকুড়া এই ৪ কেন্দ্রের ৩০ আসনে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ৩০ আসন থেকেই আসতে থাকে বিক্ষিপ্ত অশান্তির খবর। কমিশনের বেনজির নিরাপত্তা সত্ত্বেও মূলত বয়ালের অশান্তিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হতে থাকে নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি। সকাল থেকেই বয়ালের তৃণমূল নেতা অভিযোগ করছিলেন, তৃণমূলের এজেন্টকে বুথে বসতে দিচ্ছে না কেন্দ্রীয় বাহিনী। যদিও কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাল্টা দাবি করে, ওই এজেন্টের কাগজ ঠিক নেই।
এরপর বেলা গড়াতেই বয়াল থেকে ছাপ্পা ভোটের অভিযোগও তোলে তৃণমূল। জানা যায়, বয়ালে ছেলেকে হারানোর ভয়ে তৃণমূল এজেন্টকে বুথে যেতেই দেননি তাঁর মা। পাশাপাশি তৃণমূল অধিকাংশ বুথে এজেন্ট দিতে পারেনি বলেও দাবি করে বিরোধীরা। এরপর দুপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বয়াল পৌঁছলে তৃণমূল-বিজেপির সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। মমতাকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ঘাসফুল প্রার্থীকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয় জয় শ্রীরাম স্লোগান। পরিস্থিতি সামলাতে নামানো হয় আধাসেনা। হুইলচেয়ারে বসে বয়ালের ৭নং বুথে চলে যান তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুথ পরিদর্শন করে অশান্তির প্রতিবাদে আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তৃণমূল প্রার্থী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উস্কানিতেই অশান্তি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মমতা। এদিন বুথে বসেই রাজ্যপালের সঙ্গে কথা বলেন মমতা। চিঠি লেখেন কমিশনেও। বয়ালের ঘটনার রিপোর্ট তলব করে কমিশন।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই নন্দীগ্রামের দায়িত্বে থাকা আইপিএস নগেন্দ্র ত্রিপাঠীর সঙ্গে কথা বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল প্রার্থীকে দেখে বুথমুখী হতে দেখা যায় এলাকাবাসীকেও। যদিও ঘণ্টা দুয়েক পরে বুথ থেকে বেরিয়ে আত্মবিশ্বাসের সুর শোনা যায় তৃণমূল নেত্রীর গলায়। তৃণমূল সুপ্রিমোর দাবি করেন, ‘কয়েকটি জায়গায় অশান্তি হয়েছে। অভিযোগ জানানো হয়েছে। তবে ভোটে জিতছে তৃণমূলই।’ সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল জানায়, আর কোনও জায়গায় প্রার্থী হবেন না মমতা। তিনি জিতবেন নন্দীগ্রাম থেকেই।
অন্যদিকে, দিনভর নন্দীগ্রামে খোশ মেজাজেই ঘুরতে দেখা যায় আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দুকে। তাঁর জয় নিশ্চিত বলে দাবি করেন শিশির পুত্র। মমতা বয়াল, সোনাচূড়া পরিদর্শন করে রেয়াপাড়া ফেরার পর বিকেলে বয়াল পৌঁছন শুভেন্দু।
বয়াল ছাড়াও নন্দীগ্রামে বিভিন্ন বুথ থেকে মিলেছে ছাপ্পা ভোট, ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ।
তৃণমূল-বিজেপিসংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়েছে নন্দীগ্রামের একাধিক এলাকা। কমিশনের বেনজির নিরাপত্তা সত্ত্বেও শুধু নন্দীগ্রামই নয়। দ্বিতীয় দফার ভোটে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকা। খড়্গপুর সদরে ভোটারদের মারধর ও ভোটদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে। দাসপুরে বিজেপি প্রার্থীকে বুথে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে দাসপুরের ২৬৬ নং বুথ ও সংলগ্ন এলাকা। কেশপুরে দাদপুর গ্রামে তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে। কেশপুরে ভোট চলাকালীন বিজেপি প্রার্থী ও এজেন্টের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।
ডেবরা থেকে মিলেছে দফায় দফায় তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষের খবর। পাশাপাশি ডেবরায় বিজেপি প্রার্থী ভারতী ঘোষের বিরুদ্ধে টাকা বিলির অভিযোগও উঠেছে। সেখানে তৃণমূল প্রার্থী হুমায়ুন কবিরকে বুথে ঢুকতে বাধাদানের অভিযোগ উঠেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে।
অশান্তির খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে বাঁকুড়ার ৮ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৪ আসনেও। একাধিক জায়গায় থেকে মিলেছে দফায় দফায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর। উঠেছে বুথ জ্যামের অভিযোগ।
চণ্ডীপুরে তৃণমূল প্রার্থী সোহম চক্রবর্তীর গাড়িতে ‘ভাঙচুর’। জখম প্রার্থীর নিরাপত্তারক্ষী। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রিপোর্ট তলব করেছে কমিশন। বাঁকুড়ায় তৃণমূল প্রার্থী সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে টাকা বিলির অভিযোগ।
৩০ আসনে বিক্ষিপ্ত গন্ডোগোল হলেও অশান্তি খবরে শিরোনামে উঠে এসেছে মমতা-শুভেন্দুর কেন্দ্র হটস্পট নন্দীগ্রাম। অশান্তি হলেও দ্বিতীয় দফার ভোটে ভোটদানের হার ছিল চোখে পড়ার মতো। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৪ জেলার ৩০ আসনে ভোটের হার ৮০.৪৩ শতাংশ। পর্যবেক্ষকদের মতে, ৮০ শতাংশের বেশি ভোটদান নন্দীগ্রামের নিরিখে বিরলই।
পরিবর্তন না প্রর্ত্যাবর্তন। কোনপথে এগোচ্ছে বাংলার রায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা-শুভেন্দু দুই স্টার ক্যান্ডিডেটের লড়াইয়ের কারণে এবারের নির্বাচনের ভরকেন্দ্র নন্দীগ্রাম। এবার প্রথম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল নির্ভর করে আসছিলেন মহিলা এবং যুবভোটে। রিপোর্ট বলেছে, এদিন মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলে শুভেন্দু অধিকারীর অস্ত্র যদি হয় মোট ভোট থেকে সংখ্যালঘু ভোট সরিয়ে বাকিটা ঝুলিতে ভরা, মমতার তাস তবে মোট ভোট থেকে সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটের নিটফল। দিনভর নন্দীগ্রামজুড়ে শুভেন্দুর তৎপরতা নজর কাড়লেও বয়াল যাওয়াকে মমতার মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করছে ওয়াকিবহালমহল। তবে সবশেষে কার পক্ষে রায় দেয় রাজ্যবাসী। তা বলবে সময়।
Comments are closed.